উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাস্তবায়ন বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ল এন্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভা

By on August 6, 2015
BMP Legal Aid 2

১০ মে ২০১৫তারিখ দুপুর ৩টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ল এন্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে যৗন নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাস্তবায়ন বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ল এন্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু নোমান মোহাম্মদ আতাহার আলী। সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম, ভারপ্রাপ্ত লিগ্যাল এইড সম্পাদক অ্যাড. আফিফা আক্তার স্বপ্না, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ল এন্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সালেহ্ আকরাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের ডিরেক্টর লিগ্যাল আ্যডভোকেসি এন্ড লবি অ্যাড. মাকছুদা আখতার লাইলী, সিনিয়র আইনজীবী অ্যাড. রামলাল রাহা ও অ্যাড. দিপ্তী শিকদার এবং জুনিয়র আইনজীবী রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ।

 

সভায় বক্তারা বলেন  বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘ চার দশকের অধিক সময় ধরে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্র্মূলে বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে এই সংগঠন তিন দশকের অধিক সময় ধরে নির্যাতনের শিকার নারীকে আইনগত সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র ‘রোকেয়া সদন’ প্রতিষ্ঠা করে সাময়িক আশ্রয় প্রদানসহ পুনর্বাসন, আইন সংস্কার কার্যক্রম, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, এডভোকেসি-লবি, আন্দোলনমুখী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্মূল আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ নারী নির্যাতনের মামলায় আইন সহায়তা প্রদান করে থাকে। বক্তারা আরো বলেন সাম্প্রতিককালে উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাচ্ছে। বিভ্রান্ত, দিকভ্রান্ত তরুণদের উৎপাতে তরুণী ও কিশোরী মেয়েদের আত্মহননের ঘটনায় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে সারা দেশব্যাপী  জনগণ, নারী ও মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসনসহ সরকার নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে বখাটেদের উৎপাত, এই সামাজিক মানবিক সংকট থেকে তরুণীদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। পাশাপাশি আমরা লক্ষ্য করছি, তরুণ সমাজের একটি অংশ ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তরুণ সমাজের মাদকাসক্তি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী তৎপরতায় জন-জীবন অতিষ্ঠ দেখে মনে হয় তারা সুস্থ ধারার চিন্তাজগত থেকে বহুদূরে বিচরণ করছে। তাদের মধ্যে মানবতাবোধ বলতে কিছু নাই। বিশেষ করে উত্ত্যক্তের কারণে নানা ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে। উত্ত্যক্তকরণের ঘটনার প্রতিবাদ করায় শিক্ষক, অভিভাবকদের উপর আক্রমণসহ হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীসহ তরুণীদের চরম নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বিভিন্নভাবে এ সকল ঘটনায় বিবৃতি, স্মারকলিপি প্রদান, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন নারী, মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি অব্যাহত উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় বাস্তবায়ন বিষয়ে বক্তারা বলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, মতবিনিময় সভা, কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সুপারিশমালা গ্রহণ এবং নীতিমালা ও মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা গ্রহণের লক্ষ্যে উত্ত্যক্ত, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কল্পে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন, ২০১০-এর খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করার জন্য সভা করা হয়। আইন সংস্কার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পরামর্শের ভিত্তিতে উক্ত খসড়া  প্রস্তাবনা তৈরি করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহে জমা দেওয়া হয়েছে। বক্তারা উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানির কারণসমূহের মধ্যে উল্লেখ করেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও পরিবার কাঠামো, পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক অস্থিরতা তথা নিরাপত্তাহীন পারিবারিক পরিস্থিতি, সন্তানের বেড়ে ওঠা তথা সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে পিতামাতার উদাসীনতা, পরিবারে ছেলে-মেয়ের মাঝে বৈষম্য, পিতামাতার বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব, মাদকাসক্তি, দারিদ্রতা, বিরোধপূর্ণ রাজনীতি, Gender Blind সামাজিক ব্যবস্থাপনা, উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণার অনুপস্থিতি, উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি বিষয়ক অপরাধ বিষয়ে অজ্ঞতা এবং প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা।

BMP Legal Aid 1

এ বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নির্দেশাবলী সম্বলিত একটি রায় অনুসারে যে সমস্ত বিষয় যৌন হয়রানি বলে গণ্য হবে বক্তারা উল্লেখ করেন সেগুলো হলো শারীরিক স্পর্শের মত অপ্রত্যাশিত যৌনাকাক্সক্ষার ব্যবহার, প্রশাসনিক, কর্তৃত্বমূলক অথবা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ বা চেষ্টা, যৌন ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন শারীরিক বা ভাষাগত আচরণ, যৌন স¤র্পকের দাবি বা অনুরোধ, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা রসিকতা, অশালীন উক্তিসহ আপত্তিকর কোনো ধরণের কিছু করা, চিঠি, ই-মেইল, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, এসএমএস, পোস্টার, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, নোটিশ বোর্ড, দেয়াল লিখনের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং চরিত্র হনন-এর উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ, লিঙ্গীয় ধারণা থেকে বা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে শিক্ষা, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় বাধা প্রদান, প্রেমের প্রস্তাব দেয়া এবং প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখানের কারণে চাপ সৃষ্টি ও হুমকি প্রদান  এবং মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা।

 

হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশাবলীর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে তারা বলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারীর উপর যৌন হয়রানি ও নিপীড়নকে আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে, যৌন হয়রানির সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যৌন হয়রানিকে নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে, হাসপাতাল ও সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরণের সরকারি ও বেসরকারি কর্মপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তায় চলাচলকারীরাও এই নির্দেশাবলীর আওতাভুক্ত, সকল কর্মস্থল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের দায় কর্তৃপক্ষের, ঘটনা ঘটলে শাস্তি বিধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়ও কর্তৃপক্ষের  এবং যৌন নিপীড়ন ও শাস্তি সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন এবং কার্যকর শাস্তির বিধান করে এবিষয়ে আইন প্রণয়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশাবলী বা রায় পালন করা সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, এগুলো প্রয়োগের লক্ষ্যে পদক্ষেপ না নিলে তা আদালত অবমাননার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিষেয় বক্তারা উল্লেখ্য যে, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় সকল নাগরিকের জন্য অবশ্য পালনীয় বিষয়। সেই সাথে উক্ত রায়ে পরিস্কার উল্লেখ করা হয়েছে, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন না হওয়া পর্যন্ত মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় আইন হিসেবে গণ্য হবে।

 

বাংলাদেশমহিলা পরিষদ উক্ত রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে বিভিন্ন সময় ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, তরুন সমাজসহ সকল পর্যায়ের মানুষের সাথে অ্যাডভোকেসি, লবি, মতবিনিময় সভা আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকসহ সভায় মোট উপস্থিতি ছিল ৮৮জন। মতবিনিময় সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ।

About mparishad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>