একবিংশ শতাব্দীর পেশাজীবী নারীর চ্যালেঞ্জ: রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়  বিষয়ে পেশাজীবী নারী সমাবেশ

By on September 9, 2015
BMP Organization 1

 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় সংগঠন উপ-পরিষদের সাংগঠনিক মাসের কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসাবে গত ২২ আগস্ট ২০১৫ তারিখ বিকাল ৪:০০টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে “একবিংশ শতাব্দীর পেশাজীবী নারীর চ্যালেঞ্জ: রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়” বিষয়ে পেশাজীবী নারীদের নিয়ে সামবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আয়শা খানম। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। এর পর সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ পেশাজীবী নারী সামাবেশ নিয়ে প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন পেশার পেশাজীবী নারীরা এই সমাবেশে স্বতঃফুর্তভাবে উপস্থিত হন। বিভিন্ন পেশায় কর্মরত পেশাজীবী নারীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- অ্যাড. নাসিমা আক্তার, ডা: মেখলা সরকার, নতুন প্রজম্মের প্রতিনিধি প্রকৌশলী নবনিতা ইসলাম, ব্যাংকার কবিতা দাশ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর পানি সম্পদ বিভাগের অধ্যাপক উম্মে কুলসুম নাভেরা। পেশাজীবী নারী সমাবেশ পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম।

BMP Organization 2

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মালেকা বানু বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক মাস উপলক্ষে আয়োজিত এই সমাবেশে উপস্থিত উপমহাদেশের বিশিষ্ট সমাজ চিন্তক, দার্শনিক, নারী মুক্তির স্বপ্নদ্রোষ্টা রোকেয়া শাখাওয়াৎ হোসেনের অমর সৃষ্টি সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে চিত্রিত বৈচিত্রময় পেশায় কর্মরত রোকেয়ার মানসকণ্যারা আপনাদেরকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা অত্যান্ত গর্বিত, আনন্দিত এবং আহ্লাদিত। নারীরা শিক্ষা, মর্যাদা, নারী পুরুষের সমান অধিকার, নারী ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার জন্য আজ লক্ষ কোটি নারী এগিয়ে এসেছে। সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আজ নারীরা এগিয়ে চলেছে। দেশ ও সমাজকে অগ্রসর করে নিয়ে যাচ্ছে। নারীর অগ্রগতি হলে দেশের অগ্রগতি হয় নারীর উন্নয়ন হলে দেশ ও সমাজের উন্নয়ন হয়। নারী চোখে আজ মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন। নারীর চোখে আজ সমুদ্র জয়ের স্বপ্ন। নারীর চোখের আজ পর্বত আরোহণের স্বপ্ন খেলা নারীর সমতা, মর্যদা, অধিকার, দায়িত্বের জন্য আজ তার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এখানেই নারী আন্দোলনের সংগঠন হিসাবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তার দায়-দায়িত্ব কি তা চিহ্নিত করেছে। নারী আন্দোলন দশকে দশকে তার সমস্যা চিহ্নিত করে বাধার গন্ডি অতিক্রম করার জন্য লড়াই করে চলেছে এবং সেখানে সাফল্য লাভ করে চলেছে। নারীরা যাতে তার দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের পছন্দ মত পেশায় কাজ করতে পারেন, সুযোগ নয় বরং যোগ্যতার মাপকাঠিতে কাজ করতে পারেন তার জন্য বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গত চার দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছে।

BMP Organization 1

সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, নারীরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী নির্যাতন এবং অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে কর্মক্ষেত্র এখনো নারী বান্ধব নয়। নারীর কর্মক্ষেত্রে তার জন্য আলাদা টয়লেটের দরকার আছে। কোথাও কোথাও থাকলেও তা খুব অপর্যাপ্ত। এটি কর্মজীবী নারীর স্বাস্থ্যের জন্য ব্যপক হুমকি হিসেবে দাড়াচ্ছে। আমরা দেখছি যে কর্মজীবী নারীর কর্মক্ষেত্রে তার শিশু পালনের জন্য দিবাযতœ কেন্দ্র নাই। তার দায়িত্ব, চ্যালেঞ্জ কি তা তাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি তার সামনে সম্ভাবনা কি সেটাও তাকে বুঝতে হবে এবং সাহস নিয়ে তা মোকাবেলা করতে হবে। নারী কাজ করে এমন একটি পেশায় অথচ সে পেশায় পেশাজীবী হিসাবে এখনও গৃহিনী নারীর কাজ স্মীকৃতি পাইনি।

প্রকৌশলী নবনীতা ইসলাম বলেন, বর্তমানে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সংখ্যায় নারীদের পাচ্ছি পেশার ক্ষেত্রে সেই পরিমান নারীদের খুজে পাওয়া যাচ্ছে না । সরকারী নীতিমালায় পেশাজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তীতে কত সংখ্যাক নারীকে নিয়োগ দেওয়া হবে তা উল্লেখ থাকা দরকার।

BMP Organization 3

ব্যাংকার কবিতা দাশ বলেন, পৃথিবীতে অনেক অনন্য নজির আছে পুরুষের সার্থকতার পিছনে নারীরও রয়েছে নানান ধরণের অবদান। সমাজ সভ্যতা রাষ্ট্র বিনির্মানে নারীর অবদান ছিলো, আছে  এবং থাকবে। আমাদের দুইটি সত্ত্বা নিয়ে জীবন চালাতে হয়। ঘরে এবং বাইরে আমাদের প্রতিনিয়তই নানান ধরণের বাণী আমাদের ক্ষতবিক্ষত করে। তারপরেও আমরা থেমে থাকবনা, সামনে এগিয়ে যাব। আমরা যদি সামনে এগিয়ে যেতে না পারি তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না।

মুন্সিগঞ্জ জেলা বার এসোসিয়েনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. নাছিমা আক্তার বলেন, কোন নারী যদি সামনের দিকে যেতে চাই তাহলে তার ব্যক্তিত্ব, সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সাহস থাকতে হবে। যদি নিজের ভিতর সাহস, বিশ্বাস না থাকে তাহলে তিনি কোন অবস্থায়ই নির্দিষ্ট লক্ষে পৌছাতে পারবেন না। এক সময় আইন পেশায় নারীরা আসতো না, কিন্তু  এখন বিভিন্ন বারে দেখা যায় নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। নানান পেশার নারীদের এক জায়গায় জড়ো করে তাদের নিজেদের সমস্যার কথা বলার সুযোগ করে দেবার জন্য বাংলাদেশের সকল নারী অ্যাডভোকেটদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

BMP Organization 4

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি সম্পদ বিভাগের অধ্যাপক উম্মে কুলসুম নাভেরা বলেন, যে সকল নারী বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন তাদের শেখার অনেক কিছু আছে। যদি নারীদের জন্য এই বিষয়ে করনীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে তাহলে পেশাজীবী নারীরা উপকৃত হবে। মোট কথা প্রফেশনালিজম তৈরীর জন্য প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নাই। আমাদের প্রফেশনে অন্যান্য পেশার মতো অনেক সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো বদলী। যখন কোন পেশাজীবী নারী বদল হয় তখন তাদের ক্ষেত্রে চিন্তাই করা হয়না যে তার স্কুল পড়–য়া দুটো বাচ্চা থাকতে পারে। তার স্বামী কোথায় চাকুরী করে। শেষে দেখা যায তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। অনেকেই ডে কেয়ারের কথা বলেছেন। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে একটি ডে কেয়ার সেন্টার নেই।

জাতীয় মানসিক ইন্সটিটিউট এর সহকারী অধ্যাপক ডা: মেখলা সরকার বলেন, শুধুমাত্র পেশাজীবী নারীদের ক্ষেত্রেই নয় শক্তভীত নিয়ে দাড়িয়ে থাকা যে কোন নারীর ক্ষেত্রেই যেটা মূল চ্যালেঞ্জ সেটা হলো আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র এবং পরিবার। একজন পেশাজীবী নারীকে শুধু মাত্র তার কর্মক্ষেত্রেই নয় নানান জায়গায় তাকে নানান ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। তিনি বলেন, মিডিয়াতে নারীদের বিষয়গুলো আলাদা করে তুলে ধরতে হবে।

সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, আজকে বাংলাদেশের যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে চিত্র তাতে বাংলাদেশ কে সারা পৃথিবীতে একটি অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে আমরা লক্ষ্য করছি যে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে আইলা সিডর মোকাবেলা, পিসকিপিং থেকে প্যারাসুটার জাম্পিং, তৃণমূলের উন্নয়নের সকল কর্মকান্ডে, ফসল উৎপাদনে, দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নে, সামরিক বাহিনীতে, জলে স্থলে সর্বত্র যে নারীরা আজকে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের গ্রাম গঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচিত হচ্ছেন সেই নারীরা যখন প্রত্যন্ত এলাকায় তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের তিন প্রজন্মের পেশাজীবী নারী প্রতিনীধিরা এখানে কথা বলেছেন, তাদের কথার ভিতর দিয়ে আমরা বুঝতে পারলাম বেগম রোকেয়া যে সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন যেখানে তিনি বলেছিলেন যে নারী কোন জড়োয়া বস্তু নয় যে বাক্সের ভিতর বন্দি করে রাখতে হবে যে তারাও মানুষ। তারই পথ ধরে কবি সুফিয়া কামাল বলেছিলেন যে নারীর অধিকার মানবাধিকার।

BMP Organization 5

BMP Organization 6

সারা বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল¯্রােত ধারায় যে কোটি কোটি নারী দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান ভূমিকা পালন করছেন তাদের পায়ের নিচের মাটি কিভাবে আমরা আরো একটু প্রশস্ত করতে পারি আর একটু শক্ত করতে পারি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এর এই আয়োজন। এই সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে আমাদের জোড়ালো দাবী যে প্রতিটি পেশাজীবী নারী নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে নির্বিঘেœ বাড়ি থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে যাবে এবং একই ভাবে বাড়িতে ফিরবে। সেই পরিবেশ তৈরীর জন্য আমাদের শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। আজকে যারা বিভিন্ন পেশায় কাজে যোগ দিয়েছেন তারা তাদের কাজের মধ্যে দিয়ে প্রতি মূহুর্তে দশটি হাত নিয়ে কাজ করেন। তার মাতৃত্ব, নাগরিক দায়িত্ব, পেশার দায়িত্ব, সৃজনশীলতা, স্বপ্ন আকাঙ্খা তিনি প্রতি মুহুর্তে বাস্তবায়ন করার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। নারীদের কি মানুষ হিসাবে দেখা হয় নাকি সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে দেখা হয়। অর্মত সেন বলেছেন – একবিংশ শতকের উন্নয়নের বাহক হচ্ছে নারী। আমরা সেটা ভুলে যাই, নারী যে শুধু আজকেই উন্নয়নের বাহক হয়েছে তা কিন্তু নয়। যুগ যুগ ধরে নারী ছিল আছে এবং থাকবে।  নারীর সেই অদৃশ্যমান কাজের স্মীকৃতি আজকের নারী আন্দোলনের একটি বড় বিষয়। বিভিন্ন পেশায় যে প্রচলিত প্রথাগত সংকটগুলো আছে প্রতিটি সংকট সমস্যাকে ভাঙ্গার জন্য পেশাজীবী নারীদের  কাজ করতে হবে। পেশা কে পেশার মতো দেখতে হবে, সেখানে নারী পুরুষ হিসাবে দেখা যাবে না। আমরা এই বিষয়গুলোকে কারিকুলামে যুক্ত করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।

BMP Organization 8

BMP Organization 9

About mparishad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>