বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও কন্যাশিশুর উপর যৌন হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত

By on May 11, 2015
BMP Movement 1

গত ১৪ এপ্রিল ২০১৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনভর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগদেয়  নারী- পুরুষ, শিশুসহ বহুমানুষ। এর মধ্যেই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি সংলগ্ন সহ আরো কয়েকটি স্থানে একদল যুবক সংঘবদ্ধভাবে নারীর উপর বর্বর হামলা ও টেনেহিঁচরে বিবস্ত্রকরণসহ যৌন নিপীড়ন চালায়। বাংলদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উৎযাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও কন্যাশিশুর উপর যৌন হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে জাতীয় যাদুঘরের সামনে ৬ মে ২০১৫ তারিখ বিকাল ৩টায় বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ, সীমা মোসলেম, আন্দোলন সম্পাদক কাজী সুফিয়া আখ্তার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেহানা ইউনুস, আন্দোলন সম্পাদক লাইলা খালেদা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ডিরেক্টর-লিগ্যাল এডভোকেসী এন্ড লবী অ্যাড. মাকছুদা আখতার এবং আইটি অফিসার আ.স.ম. হাবিবুর রহমান এবং শ্রমজীবী নারী এলমা আখতার সমাবেশটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের -প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অ্যাডভোকেসী এ্যান্ড লবী জনা গোস্বামী।

সমাবেশে বক্তারা বলেন জাতীয় জীবনে বর্ষবরণের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় জীবনকে নবচেতনায় নির্মাণের একটি আন্তরিক ও অকৃত্রিম  আকাঙ্খা থেকেই। বর্ষবরণ উৎসব একটি সার্বজনীন উৎসব। এই নববর্ষ বহুসংস্কৃতির বৈচিত্রকে ধারণকারী জাতি বা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে সংহত করতে শক্তি যোগায়। এ-বছর ১৪২২ বাংলার নববর্ষ উৎযাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপরিকল্পিতভাবে ও সংঘবদ্ধচক্র নারী ও কন্যা শিশুর উপর যৌন হয়রানি ও  যৌন নিপীড়ন  চালায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বিগত ৪৪ বছর যাবৎ একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক আন্দোলন বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ায় চালিয়ে আসছে।  তাই এই ঘটনায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাষ্ট্র, সরকার তথা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং সমগ্র সমাজের কাছে জবাবদিহিতা চায়।

BMP Movement 2

তারা বলেন নববর্ষ উৎযাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের চত্বরে প্রকাশ্যে  নারী যখন যৌন হয়রানির শিকার হয় তখন সেখানে হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল। দুস্কৃতকারীর ২৫/৩০ জনের সংঘবদ্ধ দল এ ঘটনা ঘটিয়েছে। সে সময়ে আক্রান্ত নারীদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্র । নারীর পাশে সেদিন কেন সমাজের অধিক সংখ্যক মানুষ ছিল না, রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল না এমনিক ছিলনা  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নারী-প্রগতিবিরোধীরাই এই ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে এবং এতে সমাজে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকট প্রকাশ ঘটেছে বলে সমাবেশে বক্তারা মন্তব্য করেন। বক্তারা আরো বলেন যারা নারীর স্বাধীন চলাফেরায় বিশ্বাস করেনা, বাঙালী সংস্কৃতির চেতনায় বিশ্বাস করেনা, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করেনা তারাই এই ঘটনার জন্য দায়ী। যৌন হয়রানি, নিপীড়ন কিছু সংখ্যক অপরাধীর দ্বারা সংঘটিত বিষয় নয়। এর মূলে রয়েছে নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার মানসিকতা, নারীকে অধস্তন হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কৃতি।

BMP Movement 3

তারা আরো বলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র এলাকা ছিল পুলিশের সেইদিন সিসি ক্যামরার আওতায়। সিসি ক্যামেরা দেওয়ার অর্থ এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটর করা। সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে, কয়েকটি সংঘবদ্ধ দল জায়গায় জায়গায় জড় হয়ে নারীদের পিছু নিয়েছে, এমনকি রিকশা থেকে টেনে নামাচ্ছে ও হয়রানি করছে। সিসি ক্যামেরা যদি যথাযথভাবে দায়িত্বের সাথে মনিটর করা হতো তবে তাৎক্ষণিক পুলিশের সেই স্থানে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা গেলো পুলিশ সেই মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি এবং এখনও পর্যন্ত নিপীড়নকারীদের কাউকে পুলিশ সনাক্ত এবং গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। উপরন্তু প্রথমদিকে ঘটনাকে আমলে না নেয়ার অপচেষ্টা তারা চালিয়েছে। মহামান্য হাইকোর্টের রুল জারির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ঘটনার কথা স্বীকার করেন, তবে ঘটনার গুরুত্বও কমিয়ে দেখার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রমাণ করে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার কারনে অপরাধীরা নির্বিঘেœ অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার প্রসঙ্গটিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি করে তারা।

BMP Movement 4

BMP Movement 5

বক্তারা পুলিশ প্রসাশনের সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। নিরবিচ্ছিন্নভাবে একের পর এক এইসব ঘটনা কেন ঘটে চলেছে, তা আজ নিবিড়ভাবে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের স্বার্থেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে বক্তারা মনে করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশ ও নারী উন্নয়নে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্নমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তখন এই ধরনের ঘটনা সরকারের সদিচ্ছা এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। অপরাধীগণ অপরাধ করে সাজা পায় না বলেই সাধারণ মানুষ এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে নিরুৎসাহিত বোধ করে বা ভয় পায়। সামাজিক এই অবক্ষয় তৈরিতে সরকার কি তার দায় এড়াতে পারে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন বক্তারা। সবশেষে সামাবেশ থেকে বেশ কিছু দাবি উঠে আসে। তার মাঝে গুরূত্বপূর্ণ দাবিগুলো হলো-যৌন নিপীড়নকারীদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নারীদের উপর হামলা ও যৌননিপীড়ণের ঘটনায় সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত চিত্রের মাধ্যমে জড়িতদের অবিলম্বে সনাক্ত করতে হবে, বর্ষবরণের দিনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়ে  তদন্ত করে  চাকুরী বিধি অনুযায়ী  শাস্তি প্রদান করতে হবে, অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে হবে, ঘটনার দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনকে জবাবদিহীতার আওতায় আনতে হবে, নারী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে অবিলম্বে যৌন নিপীড়ণ ও উত্ত্যক্তকরণ বিষয়ক মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের আলোকে পৃথক আইন প্রণয়ন করতে হবে, যে কোন ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা প্রচার মাধ্যমে নারী অধিকার বিরোধী ও নারীর মর্যাদা ক্ষুন্নকরে এমন বক্তব্য প্রদান বন্ধ করতে হবে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে নারী জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

About mparishad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>