মনোরমা বসু (১৮৯৭-১৯৮৬)

মনোরমা রায়ের জন্ম ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর, বরিশাল জেলার বানাড়ীপাড়া থানার নরোত্তমপুর গ্রামে। বাবা নীলকন্ঠ রায় ও মা প্রমদাসুন্দরী রায়। মনোরমা ছিলেন বাবা-মা’র পঞ্চম সন্তান। সেই সমস্ত বিপ্লবী যারা জীবন দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছিল তাদের একজন মনোরমা বসু। যিনি ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে লড়েছেন। তিনি বরিশালের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ক্ষুদিরামের ফাঁসি তার মনকে স্পর্শ করে মাত্র 11 বছর বয়সে।তিনি 1930 সালে বরিশাল শহরের কংগ্রেস নারী কর্মীদের সাথে যোগ দেন ও 1938পরবর্তীকালে কমউনিষ্ট মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন।মাত্র তের বছর বয়সে মনোরমার বিয়ে হয় বরিশালের বাঁকাই গ্রামের বিপত্নীক জমিদার চিন্তাহরণ বসুর সাথে।১৯২৫ সালে মাহাত্মা গান্ধী রাজনৈতিক প্রচারণা এবং তহবিল সংগ্রহের সংগ্রহের জন্য বরিশাল এলে মনোরমা বসু নিজের গহনা দান করেন। বরিশালে গান্ধীর সাথে এই সাক্ষাৎ তাঁকে আরো উজ্জীবিত করে তোলে। তিনি ব্রিটিশদের শৃঙ্খল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং বিপ্লবী মনোরমা বসু মাসিমা নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি শুধু ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেননি, মানুষের মুক্তির জন্যও আন্দোলন করে গেছেন সারাজীবন। বরিশাল শহরে নিজ বাড়িতেই গড়ে তোলেন ‘মাতৃমন্দির’ । কুমারী মা, স্বামী পরিত্যক্তা, বিপথগামী ও আশ্রয়হীনা মেয়েদের আশ্রয়স্থল এই ‘মাতৃমন্দির’। অসহায় মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে গড়ে তোলেন ‘নারী কল্যাণ ভবন’, শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য ‘মুকুল-মিলন খেলাঘর আসর’, সাধারণ মানুষের জ্ঞানের জন্য ‘পল্লীকল্যাণ অমৃত পাঠাগার’, নারী জাগরণ ও নারী অধিকার রক্ষায় ‘নারী আত্মরক্ষা সমিতি’, ‘মহিলা সমিতি’ ও ‘মহিলা পরিষদ’সহ নানা সংগঠন।
১৯৩০ সাল থেকে ভারতে কংগ্রেসের ডাকে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন করায়  জীবনে প্রথম ৬ মাসের জেল ও ১৫০ টাকা জরিমানা হয়।

তিনি নিজের বাড়িতে পাড়ার ও নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে গড়ে তোলেন মাতৃমন্দির সরকারী আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর্থিক সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি বাড়িতে বাড়িতে মুষ্টি-ভিক্ষার ঘট বসালেন।

মাতৃমন্দিরের এই কঠিন কাজ করার পাশাপাশি মনোরমা বসু রাজনৈতিক কাজেও কঠোর পরিশ্রম করেন এসময়।তিনি ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে কলকাতা শহরের মতো বরিশালেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে তোলেন মনোরমা বসু। তিনি এর প্রথম নির্বাচিত সম্পাদক হন।

১৯৪৮ সালে সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে দেখা দিল দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিকার চেয়ে ৫ জুন বুভুক্ষু মেয়েদের নিয়ে বরিশালে মিছিল করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের সামনে। ফলে পুলিশ তখন তাদের উপরেও লাঠিচার্জ করে। মহিলা সমিতির ৪ জন নেত্রীসহ ৮ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসময় প্রায় ১০ মাস বিনাবিচারে কারাগারে আটক ছিলেন। পরে ৪ বছরের জেল হয় এবং জেল থেকে তিনি ছাড়া পান ১৯৫২ সালের ২৫ এপ্রিল।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ বরিশালের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। এবছর দেশের দক্ষিণ উপকূল জুড়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়। মনোরমা দেশের নানাস্থানে গিয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করেন এবং তা সন্দ্বীপ ও পটুয়াখালির নিম্নাঞ্চলে বন্যার্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মনোরমা বসু জুন মাসে চলে যান ভারতে। সেখানে গিয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রচারণা, অর্থ সংগ্রহ, নারীদের সংঘটিত করা ইত্যাদি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত হন। মহিলা পরিষদের উদ্যোগে বয়স্কা মহিলাদের জন্য কালীবাড়ি রোডের চন্ডীসদনে স্থাপন করেন বৈকালিক স্কুল।১৯৭৪ সালে তিনি সোভিয়েত নারী কমিটির আমন্ত্রণে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়া ভ্রমণ করেন।

১৯৮৩ সাল থেকেই তিনি বার্ধক্য আর নানা জড়ায় পীড়িত হতে থাকেন। অবশেষে এই মহিয়সী নারী ১৯৮৬ সালের ১৬ই অক্টোবরে মৃত্যুবরণ করেন তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মাতৃমন্দিরে। মনোরমা বসুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তাঁকে ১৯৯২ সালের ১১ মার্চ মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে। পরে ১৯৯৭ সালে শেরেবাংলা পদক (মরণোত্তর), ১৯৯৮ সালে মহিলা পরিষদ কর্তৃক সম্মননা (মরণোত্তর), ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বেগম রোকেয়া পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া যাবতীয় সম্পত্তি নিয়ে ২০০১ সালে গঠন করা হয় ‘মনোরমা বসু মাসিমা স্মৃতি ট্রাস্ট’।