সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবস

By on August 2, 2015
BMP Movement 9

“সহিংসতামুক্ত মানবিক রাজনীতি চাই, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণীর সকল পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমঅংশীদারিত্ব চাই” এই স্লোগানকে সামনে রেখে ৬৮ টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে বিকাল ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব জনাব তারিক-উল-ইসলাম। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নারীর অধিকার, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতষ্ঠার দাবিতে এ দিনটি পালন করে। এবার নারী দিবসের আন্তর্জাতিক শ্লোগান ÔEmpowering Women, Empowering Humanity: Picture it!  প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে  নারীর ক্ষমতায়ন, মানবতার উন্নয়ন ।

সমাবেশের শুরুতে রাজনীতির নামে সহিংসতায় নারী-শিশু সহ যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং রাজনীতির নামে সহিংসতায় নিহত ও আহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহিংসতার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানো হয়।

সমাবেশের ঘোষণাপত্রে দাবি জানানো হয় যে, অবিলম্বে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে নারী, শিশুসহ মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিকার করতে হবে;  রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে সহিংস, সন্ত্রাস ও বোমানির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে; সরকারকে রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে; সরকারকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; বর্তমানের সংকট উত্তরণে সরকার ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক সকল রাজনৈতিক দলকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে; পেট্রোলবোমা, ককটেল ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করার লক্ষ্যে এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সরকারকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে, মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের আলোকে মৌলবাদী অপশক্তি জামায়াতে ইসলাম এবং ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে; ৭২’ এর সংবিধানের নীতিমালাসমূহ সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে; জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদের ২ ও ১৬-১(গ) ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে পূর্ণ অনুমোদন ও  বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে; জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, দলিত, ট্রান্স-জেন্ডার গ্রুপসহ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখতে হবে;  জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার দিতে হবে; নারীসহ দেশের সকল মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে; আগামী দিনের উন্নয়ন কর্মসূচিত নারী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

BMP Movement 1

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নারী মুক্তি সংসদের সভাপতি হাজেরা সুলতানা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রাখীদাশ পুরকায়স্থ; ব্র্যাক এর জেন্ডার জাস্টিস এন্ড ডাইভারসিটি পরিচালক শীপা হাফিজা; কর্মজীবী নারী এর নির্বাহী সদস্য উম্মে হাসান; আইইডি নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ; হিল উইমেন্স ফেডারেশন সভাপতি চঞ্চনা চাকমা; ব্র্যাকের প্রতিনিধি চিররঞ্জন সরকার, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের মহুয়া পাল এবং দলিত নারী ফোরাম এর সভাপতি মনি রানী দাস উপস্থিত ছিলেন।

ঘোষণা পাঠ করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার দিলীপ কুমার সরকার।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব জনাব তারিক-উল-ইসলাম বলেন, আমরা চাইনা রাজনৈতিক সহিংসতায় এ দেশের নারী-শিশুরা অকালে তাদের প্রাণ হারান। পেট্রোলবোমার হাত থেকে রেহাই পাননি নয় মাসের গর্ভবতী নারী ও শিশুরা। আমাদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে এবং সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে। হিল উইমেন্স ফেডারেশন, দলিত নারী ফোরাম, প্রতিবন্ধী ফোরাম যে দাবীগুলো রেখেছেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়গুলো যেন যুক্ত করা হয় তার প্রতি দৃষ্টি দেয়া হবে। সবশেষে ভবিষ্যতে তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে একত্রে কাজ কারার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।

BMP Movement 2

সভাপতির বক্তব্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ৭ মার্চ এর বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্যদিয়ে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি এবং দেশকে স্বাধীন করি। কিন্তু বর্তমানে দেশে ধর্মান্ধ জঙ্গী, মৌলবাদেরা এদেশের উন্নয়নের গতি রোধ করছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে নারী। প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধ, উদারপন্থী ও মুক্তচিন্তার দেশ আমরা যদি দেখতে চাই তাহলে যে রাজনৈতিক দল এই চেতনাকে ধারণ করবেনা আমরা তাদের প্রত্যাখ্যান করবো। নতুন প্রজন্মকে এই দাবী আদায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে।

BMP Movement 3

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, ১৯১১ সালে ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয় তার মধ্যদিয়েই সূচনা হয় ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন। আমরা এখানে দাড়িয়ে তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। স্মরণ করছি তাদের যারা উপমহাদেশের নারী সমাজের উন্œয়নের জন্য কাজ করেছেন। এই সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের নাম অবশ্যই এ দেশের উন্নয়নে লিপিবদ্ধ থাকবে। অতিসম্প্রতি তরুণ সমাজের প্রতিনিধি অভিজিত রায় এবং তার আগে অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদকে নৃ:শংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। বেইজিং কর্মপরিকল্পনার এবার ২০ বছর। বৈশ্বিক পরিসরে, বৈশ্বিক উন্নয়নের সাথে বাংলাদেশের নারীদের যোগসূত্র আজ আমরা দেখতে পারছি। রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার ও সংস্কৃতি এখনও নারীবান্ধব নয়, তাই রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয় নারী। অর্থনীতিতে দেখছি নারীর অবস্থা অসম। নারীর সকল প্রকার অসম অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার লক্ষ্যে আমাদের দাবী সম্পদ-সম্পত্তিতে সমঅংশীদারীত্ব ও সমান অংশগ্রহণ সরকার, রাষ্ট্র ও পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪  এর নারীর বিয়ের বয়স কোন রকম পরিবর্তন ছাড়া ১৮ বছর বহাল রাখার দাবি জানান তিনি।

BMP Movement 4

সমাবেশে বক্তারা বলেন, এবারে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আজ আমরা যখন এখানে নারী দিবস উদযাপন করছি তখন নারী আন্দোলনের কুড়ি বছরের সাফল্য ও অর্জনের বিশ্লেষণে নিউইয়র্কে সিএসডব্লিউ অধিবেশনে অনেকে একত্রিত হয়েছেন। ২০১৫ এর পর বিশ্ব নারী আন্দোলন কি করতে চায়, কোন আঙ্গীকে করতে চায় তাও এখানে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশে আজ যে অগ্রগতি তার পেছনে রয়েছে নারীর অবদান। কিন্তু পাশাপাশি নারীরা নানা ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হচ্ছে। বাল্যবিবাহসহ নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও কর্মক্ষেত্রে নারী বান্ধব পরিবেশ তৈরি সবচেয়ে জরুরী। ১০০ বছরের বেশী অতিক্রম করে নারীরা আজও তাদের লক্ষ্যে পৌছাতে পারেনি। শুধুমাত্র নারী হিসেবেই নয়, আদীবাসী, প্রতিবন্ধী ও দলিত নারীরা নারী হিসেবে দ্বিতীয় মাত্রার নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

BMP Movement 5

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিবাদী সঙ্গীত পরিবেশন করেন হিমাদ্রী শেখর ও মাহবুব আখতার। এবং প্রতিবাদী কবিতা আবৃত্তি করেন লায়লা আফরোজ ও স্বাতী দাশ গুপ্তা। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশেরপ্রোগ্রাম ম্যানেজার দিলীপ কুমার সরকার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উই ক্যান ক্যাম্পেইন এর জিনাত আরা হক ।

 

BMP Movement 6

BMP Movement 7

BMP Movement 8

আন্তর্জাতিক নারীদিবসে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ঘোষণা পত্র দেওয়া হয়-

 

মার্চ ২০১৫, বিকাল .০০টা,

ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট, ঢাকা

৮ মার্চ ২০১৫, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আমরা বাংলাদেশের নারী আন্দোলন, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মরণ করছি, ১৮৫৭ সালের এইদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের সেই বীরত্বগাথা, যারা মজুরি বৃদ্ধি ও শ্রম সময় ১৬ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। ১৯০৮ সালের একই দিনে কর্মঘণ্টা হ্রাস, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে নিউইয়র্ক শহরের নারীশ্রমিকেরা আন্দোলনে নামে। ১৯১০ সালে সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেৎকিন-এর প্রস্তাবক্রমে ৮ মার্চকে ‘নারীদিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারীদিবস হিসেবে উদ্যাপন করে। এরপর থেকে জাতিসংঘভুক্ত প্রতিটি দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবস হিসেবে উদ্যাপিত হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নারীসমাজসহ সমাজের সচেতন মহল এই দিনটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে। এ বছর আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটির প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছেÑদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এবারে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি সহিংসতামুক্ত মানবিক রাজনীতি চাই, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সকল পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমঅংশীদারিত্ব চাই’ এই প্রতিপাদ্যেরে ভিত্তিতে দিবসটি পালন করছে।

প্রিয় ভাইবোনেরা,

দীর্ঘ চার দশক ধরে এদেশের নারীসমাজ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, রাষ্ট্র ও পরিবার কর্তৃক নারী নির্যাতন বন্ধ, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ, নারী অধিকার বিশেষ করে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীকে সম্পৃক্ত করার ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে (২০০২ সালের মে মাসে) দেশের ২৫টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি”। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই জোট অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক দেশ গঠনের লক্ষ্যে আন্দোলন করে আসছে।

দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে আমরা এবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করছি। আমরা গভীর ক্ষোভ, দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা জনজীবন ও জাতীয় জীবনকে গ্রাস করছে। আমরা জানি, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য সরকার, বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দল এবং সমগ্র দেশবাসীর দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বহু ত্যাগের মাধ্যমে প্রাপ্ত গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের নামে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি তাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষ। নারী, শিশুসহ সাধারণ মানুষ আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। পেট্রোল বোমাসহ নানা সহিংসতার কারণে সাধারণ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, সবসময় আতঙ্কে থাকছে; ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি পালন দিনে দিনে সহিংস সন্ত্রাসী আকার ধারণ করছে। ককটেল, পেট্রোল বোমা বিস্ফোরণ, আগুন ও সহিংসতায় প্রতিদিন মানুষ দগ্ধ হচ্ছে। গত দুই মাসে নারী-শিশুসহ প্রায় একশ জন মানুষ নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতা ও বোমা-ককটেল মেরে মানুষ হত্যার রাজনীতি আগামী দিনে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায় কি নাÑতা নিয়ে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কোনোভাবেই কোনো গণতন্ত্রকামী নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই নৈরাজ্যের সুযোগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যারা বানচাল করতে চায় সেই শক্তিও  সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিবহন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিশিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, রিক্সাচালক, দোকানদারসহ খেটে খাওয়া মানুষ চরম বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিনামদর্শী আচরণের কারণে সংকট ক্রমেই গভীর হিচ্ছে।  দেশের এই পরিস্থিতি আমাদের কারও জন্যই শুভ নয়। তাই আজকের এই সমাবশ থেকে আমাদের জোর দাবিÑ  এই অচলাবস্থা নিরসনে সকল রাজনৈতিক দলকেই জনস্বার্থ, জননিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সবাইকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

অনেক ত্যাগ, রক্ত, অনেক সংগ্রামের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। আজকের এই সমাবেশ দলীয় কর্মসূচির নামে জনস্বার্থ বিঘিœত করা, দেশের সম্পদ বিনষ্ট করা, দেশের চলমান অগ্রযাত্রা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিনষ্ট করার অপচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ, নিন্দা ও ক্ষোভ জানাচ্ছে।

আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়তে হলে সকল রাজনৈতিক দলকে জনগণের প্রতি আরও দায়বদ্ধ হতে হবে। দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জনগণের মৌলিক অধিকারÑ নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে হবে। সামাাজিক প্রতিরোধ কমিটি সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান জানায় এবং গভীর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এ দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, সমাজনীতি থেকে অর্থনীতি, উন্নয়নের সর্বস্তরে নারীর অবদান ও ত্যাগ জাতির অগ্রগতির অন্যতম শক্তি। আজ বাংলাদেশ শত প্রতিকূলতার মাঝেও যে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখছে তার অন্যতম কারণ উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে নারীর সমঅংশগ্রহণ। বিশেষ করে, দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছে তার মূলে আছে পোশাক শিল্প। বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আসছে এই শিল্প থেকে। এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ৮০% নারী, যাদের শ্রম আর ঘামের বিনিময়েই গ্রামপ্রধান এ দেশের গ্রামীণ ও শহুরে জনপদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয় যে, আজও ঘরে-বাইরে নারীর এই অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি নেই। নারী একদিকে কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, মজুরিবৈষম্যসহ নানাবিধ শোষণ-বঞ্চনার শিকার, অন্যদিকে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী একটি মহল নারীবিরোধী নানা অযৌক্তিক, অসাংবিধানিক দাবি তুলে নারীর অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি নীতিনির্ধারণীর সকল পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমঅংশীদারিত্ব দাবি করছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে সুষ্পষ্ট ভাবে বলতে চাই

 

১.অবিলম্বে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে নারী, শিশুসহ মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিকার করতে হবে।

২.রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে সহিংস, সন্ত্রাস ও বোমানির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

৩.সরকারকে রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৪.সরকারকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫.বর্তমানের সংকট উত্তরণে সরকার ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক সকল রাজনৈতিক দলকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

৬.পেট্রোলবোমা, ককটেল ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করার লক্ষ্যে এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৭.রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার সরকারকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে, মহমান্য হাইকোর্টের রায়ের আলোকে মৌলবাদী অপশক্তি জামায়াতে ইসলাম এবং ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

৮.৭২এর সংবিধানের নীতিমালাসমূহ সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৯.নীতি নির্ধারণী সকল পর্যায়ে নারীর সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

১০.জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদের ২ ও ১৬-১(গ) ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে পূর্ণ অনুমোদন ও  বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে;

১১.জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, দলিত, ট্রান্স-জেন্ডার গ্রুপসহ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখতে হবে;

১২.জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার দিতে হবে।

১৩.নারীসহ দেশের সকল মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১৪.আগামী দিনের উন্নয়ন কর্মসূচিত নারী উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে

১.বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

২.আইন ও সালিশ কেন্দ্র

৩.স্টপস টুয়াডর্স ডেভেলপমেন্ট

৪.বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

৫.ব্র্যাক

৬.উইমেন ফর উইমেন

৭.কেয়ার বাংলাদেশ

৮.কর্মজীবী নারী

৯.জাতীয় শ্রমিক জোট

১০.কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড

১১.মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

১২.বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি

১৩.এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ

১৪.নিজেরা করি

১৫.জাতীয় মহিলা সংস্থা

১৬.ঢাকা ওয়াইডব্লিউসিএ

১৭.পল্লী  দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন

১৮.অক্সফাম জিবি

১৯.মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ

২০.দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ

২১.আওয়াজ ফাউন্ডেশন

২২.প্রিপ ট্রাষ্ট

২৩.এডিডি বাংলাদেশ

২৪.ওয়ার্ল্ড ভিশন

২৫.গণসাক্ষরতা অভিযান

২৬.নাগরিক উদ্যোগ

২৭.ঢাকা ডেভেলপমেন্ট ফোরাম

২৮.আইইডি

২৯.প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ

৩০.সারি

৩১.বাউশি

৩২.পাক্ষিক অনন্যা

৩৩.এসিডি রাজশাহী

৩৪.ব্রতী

৩৫.নারী মৈত্রী

৩৬.প্রদীপ

৩৭.পেশাজীবী নারীসমাজ

৩৮.ওয়েভ ফাউন্ডেশন

৩৯.ইক্যুয়িটি এন্ড জাস্টিস ওয়ার্কিং গ্রুপ

৪০.বিডিপিসি

৪১.যুক্ত

৪২.বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ

৪৩.নারী উদ্যোগ কেন্দ্র

৪৪.জাতীয় নারী শ্রমিক জোট

৪৫.সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন

৪৬.বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

৪৭.জাতীয় নারী জোট

৪৮.শক্তি ফাউন্ডেশন

৪৯.বিপিডব্লিউ ক্লাব

৫০.উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী

৫১.এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশন

৫২.নারী মুক্তি সংসদ

৫৩.সেবা নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

৫৪.ডিআরআ

৫৫.জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম

৫৬.হিল উইমেন্স ফেডারেশন

৫৭.প্রশিকা

৫৮.উইক্যান  ক্যাম্পেইন

৫৯.বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

৬০.বাংলাদেশ ফেডারেশন  অব ইউনিভার্সিটি উইমেন

৬১. সরেপটেমিষ্ট ইন্টারন্যাশন্যাল ক্লাব, ঢাকা

৬২.আর ডি আর এস

৬৩.এডাব

৬৪. বিল্স

৬৫.এসডিএস জয়পুরহাট

৬৬.এফপিএবি

৬৭.ওয়াই ডাব্লিউসিএ অব বাংলাদেশ

৬৮.দলিত নারী ফোরাম

About mparishad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>