সিডও দিবস-২০১৫

By on September 17, 2015
BMP International 1

স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে চাই সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন বাস্তবায়ন

৩ সেপ্টেম্বর সিডও দিবস। উক্ত দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বিকাল ৩:৩০ মিনিটে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘‘স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে চাই সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন’এই শ্লোগানকে সামনে রেখে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ্দীন মালিক, চ্যানেল একাত্তরের প্রেজেন্টার মিথিলা ফারজানা এবং সাংবাদিক অদিতি রহমান। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আয়শা খানম।

আলোচনা সভার শুরুতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেক বানু বলেন, সিডও দলিল  নারী-পুরুষের সমতার কথা বলে, নারী-পুুরুষের বৈষম্য দূর করার কথা বলে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭০ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। তাই এ সিডও দলিল যখন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হাতে আসে, তখন থেকে একে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। পাশাপাশি এর পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে একক এবং যৌথভাবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সরকার এখনো সিডও’র সংরক্ষিত দুটি ধারা, ধারা ২ এবং ধারা ১৬-১[গ] থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করছে না। আমরা আশা করি সরকার খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিবে।

সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করে বলেন‘ নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসমতা এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যের মূলে গৎবাঁধা সনাতনী প্রথা-অভ্যাস দূর করার লক্ষ্যে পুরুষ ও নারীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের ধরন পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে সিডও সনদের ৫ নং ধারায়। এই ধারার সাথে সংবিধানের ২৮ (১), ২৮ (২) ধারার সামঞ্জস্য থাকলেও এই ধারা সংশ্লিষ্ট কোনো আইনকানুন এখনো প্রণীত হয়নি। এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমে নারীর সনাতনী ভূমিকা চিত্রিত করা হয়।  বাণিজ্যিক সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে এখনো নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে পুরুষের অভিন্ন ভূমিকা ও দায়দায়িত্ব এখনো সামাজিকভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নাই।”ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের অসমতার শৃক্সক্ষলে এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মের নারীদের জীবন কঠিনভাবে বাধাঁ। ১৬.১-এর(গ) ধারায় সংরক্ষণ বিবাহের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারী  হিসেবে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দকে অগ্রাহ্য করার মত পশ্চাদপদ  একটি সংস্কৃতিকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে চলেছে। এর বহুমাত্রিক প্রভাব পরিবারে অধিকার এবং মর্যাদার দিক থেকে নারীর অধ:স্তন অবস্থানকে শক্তিশালী করে।  সমাজে-পরিবারের নারীর এই অসম অবস্থান, অধিকারহীনতা তার প্রতি বৈষম্য এবং নির্যাতনকে টিকিয়ে রাখে। কোন উন্নয়ন, কোন অগ্রগতিকেই স্থায়ী হতে দেয় না।BMP International 2

সভায় বিশেষ অতিথি সাংবাদিক অদিতি রহমান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে জুনিয়র থেকে সিনিয়র সাংবাদিক হয়েছি এর বেশী কিছু নয়। বিভিন্ন পদবী থাকা সত্বেও অধিকাংশ পদ বিশেষ করে নীতি নির্ধারণী পর্র্যায়ে নারীদের অনুপস্থিতি লক্ষ করার মতো। যতই বলা হয় মিডিয়াতে অনেক নারী সাংবাদিক এসেছে, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে রিপোর্টার নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তা উল্লেখ করার মতো নয়। মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে মেয়েরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বর্তমানে অনেক কর্মক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারনে কর্মজীবী নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্ণিত করছে। অর্ধেক জাতিকে অন্ধকারের মধ্যে রেখে কোনভাবেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলেন, মহিলা পরিষদ দীর্ঘদিন যাবৎ সিডও বিষয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। তাত্ত্বিক দিক থেকে বলা হয় যে, পারিবারিক বিষয়গুলো ধর্মীয় আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তাই এসব ক্ষেত্রে আইন পরিবর্তিত করা যাবেনা। ২০০ বছর আগের ব্রিটিশ শাসনকালে আমাদের শিখিয়েছিল যে পারিবারিক আইনগুলো ধর্মীয় আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ব্রিটিশরা নানা আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, পারিবারিক আইনটি আমাদের ধর্মের ক্ষেত্রে পরিপন্থী নয় অথচ প্রতিটি আইন সম্পর্কে ধর্মে স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। নানা আইন পরিবর্তিত হলেও একমাত্র পারিবারিক আইনে নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে ধর্মের অজুহাত দেয়া হয়। তিনি বলেন, শুধু নারীর প্রতি বৈষম্য টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ সংবিধানে উল্লেখ আছে রাষ্ট্র কোন নাগরিকের প্রতি কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। অন্যান্য অপরাধে অনেক বেশি অভিযুক্তরা সাজা ভোগ করে কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সেই পদগুলোতে নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার বলে মত দেন।

BMP International 3

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের পরিক্রমনে সিডও সনদ একটি মাইলফলক। আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হলো, কোন রাষ্ট্র কোন বিশেষ কারনে আপত্তি রাখলেও শর্ত থাকে চুক্তির মূল উপজীব্য বা প্রধান লক্ষ্য থেকে কোনভাবেই বিচ্যুত হওয়া যাবেনা। সিডও সনদের মূল প্রাণ হল ধারা ২। কিন্তু আন্তর্জাতিক এ আইনের মূল ধারায়ই বাংলাদেশ সংরক্ষণ আরোপ করে রাখা রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে সনদের মূল লক্ষ্যকেই আঘাত করা হয় যার মাধ্যমে এই সনদের আইনী মূল্য হারায়। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বৈষম্য এবং সমতা নিশ্চিত করা অনেক দূরূহ হয়ে পড়েছে। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিরসনের অঙ্গীকারনামার বাস্তবায়নে মানবাধিকার এবং নারী অধিকার আদায়ে আন্দোলন কর্মীরা কাজ করে চলেছে।  ধর্ম থেকে বিচ্যুতি না ঘটিয়েও বা ধর্মকে আঘাত না করেও আমাদের দেশে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের পঁচাত্তরের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট এক না মন্তব্য করে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা দুরহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। সমাজের কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। সে জন্য নারীদের তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে বেশি করে পুরুষ সহযোগীদের অংশগ্রহণ করতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন।

চ্যানেল একাত্তরের নিউজ প্রেজেন্টার মিথিলা ফারজানা বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে। নারীরা অনেক এগিয়ে এসেছে। আইনের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের দিকে এগোয়। সম্পত্তিতে সমঅধিকারের বিষয়ে সামাজিকভাবে সকল স্তরের মানুষ মেনে নিতে প্রস্তুত কিনা তা দেখার বিষয়। তিনি বলেন নারীর বৈষম্য নিরসনে মিডিয়াতে নীতিমালার মাধ্যমে নারীর অধিকার বা নারী ইস্যুতে নির্দিষ্ট সময় সংবাদ প্রচার করতে হবে। সংবাদপত্রগুলোতে নির্দিষ্ট কলাম বরাদ্দ রাখতে হবে যেখানে নিয়মিতভাবে নারী বিষয়ক সংবাদ প্রচার হবে।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, এদেশের নারীরা আইলা মোকাবেলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। কাজেই সমাজে নারী-পুরুষের যে চলমান বৈষম্য তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতি বছরই একটি নতুন বিষয় নিয়ে সিডও দিবস উদযাপন করে থাকে যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সিডও সনদের অগ্রগতি কতটুকু তা পর্যবেক্ষণ করা। সিডন সনদ বিষয়ে তিনি বলেন, সিডও সনদের ধারা ২ এবং ১৬(১) গ থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার না করলে তা আমাদের সংবিধানের ধারা ২৬, ২৭, ২৮ এবং ২৯-এর সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হবে।তিনি বলেন, গত দুই দশক যাবৎ বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে অগ্রগতির পথে চলেছে। সামগ্রিকভাবে নারীরা শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে। এতে পরস্পর বিরোধী একটি অবস্থান চলছে।

তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াকে ধারণ করে, নারী সংগঠনগুলোর সাথে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে সিডও বাস্তবায়ন আন্দোলনে কাজ চলছে। তবে এই আন্দোলন আমাদের আরো জোরালো করা প্রয়োজন। সরকার গত দুই দশক ধরে বলছেন সিডও সনদের ধারা ২ অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনাধীন। তিনি অবিলম্বে এই ধারাসহ সিডও সনদ পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে সুপারিশ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক উপ-পরিষদের সদস্য মিতা মাহবুব। সভা পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক উপ-পরিষদ সদস্য ফেরদৌস জাহান রত্না। সভায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় পরিষদ সদস্য, উপ-পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগর শাখার নেত্রীবৃন্দ, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধি, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ এবং সংগঠনের অফিস কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

About Bangladesh Mahila Parishad

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>