বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক দেশ ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে একসূত্রে গ্রথিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিলগ্নে ১৯৭০ সনের ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের ছাত্রী তরুণীদের এক অংশ এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ সচেতন নারী সমাজের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের অঙ্গীকার নিয়ে কবি সুফিয়া কামলের নেতৃত্বে অধিকার ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে গঠিত হয় আন্দোলনমুখী জাতীয়ভিত্তিক, অরাজনৈতিক এই স্বেচ্ছাসেবী গণ নারী সংগঠন। অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্র ও নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করে মহিলা পরিষদ। নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বিভিন্নমুখী পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করে গড়ে উঠেছে মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক ভিত্তির গ্রহনযোগ্যতা।

নারীর অধিকার মানবাধিকার এ শ্লোগান নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ পরিচালনায় নারীর সমঅংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা, নারীর ব্যক্তি অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা সামগ্রিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে চার দশকের অধিক সময় ধরে নারী সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করে আন্দোলন পরিচালনা করছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। নারীর অধিকার বিষয়ে মহিলা পরিষদের রয়েছে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী। নারীর অধিকার বিষয়ে মহিলা পরিষদের রয়েছে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী, ১২টি পৃথক উপ-পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় সংগঠনের বহুমুখী কার্যক্রম।

 

সংগঠন উপপরিষদ

সংগঠন উপ-পরিষদ দেশের নারী সমাজকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে সারা দেশে বিস্তৃত করেছে শক্তিশালী সংগঠন। শুভানুধ্যায়ী থেকে সাধারণ সদস্য, সাধারণ সদস্য থেকে কর্মী, কর্মী থেকে সংগঠক হওয়ার প্রক্রিয়ায় সংগঠনের জেলা, উপজেলা/থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম ও পাড়া অর্থাৎ শহর ও গ্রামাঞ্চলে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হয়ে চলেছে সংগঠন। সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো নীচ উপর ও উপর নীচ পদ্ধতিতে পরিচালিত। লিখিত গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রের অনুসরণে সকল পর্যায়ে অংশগ্রহনমূলক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয় সংগঠনের কার্যক্রম। গঠনতন্ত্র ও ঘোষনাপত্রের ভিত্তিতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, স্বেচ্ছাসেবায় আগ্রহী ১৬ বছরের উর্ধ্বে নারীদের সংগঠনের সদস্য করা হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বর্তমানে ৬১টি সাংগঠনিক জেলা শাখা রয়েছে। কর্মী সংগঠকদের দক্ষতাবৃদ্ধি গুনগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ ও পুনপ্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত।

পেশাদারী দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সংগঠকের নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা, সংগঠনকে শহর ও গ্রাম পর্যায়ে (তৃণমূলে) অব্যাহতভাবে বি¯তৃত করা ও শক্তি সংহত করা সংগঠন উপ-পরিষদের অন্যতম কাজ। একই সঙ্গে পুরুষ জনগোষ্ঠীকে এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনে আগ্রহী করা।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে গ্রহণ করা হচ্ছে বহুমুখী কর্মসূচী। কৃষক নারী, শ্রমিক নারী, আদিবাসী ও পেশাজীবী নারীদের সংগঠিত করা, তৃণমূল নারীদের সাথে মতবিনিময় করা হয় ধারাবাহিকভাবে। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পুরুষদের সম্পৃক্ত করা সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী। সংগঠকদের পেশাদারী দক্ষতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্বেও বিকাশ বিশেষত: তরুণী নেতৃত্ব গড়ে তোলার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সংগঠকদের স্বেচ্ছাশ্রম, আদর্শিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক আস্থাকে সামাজিক মূলধন করে বৃহত্তর নারী সমাজকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগঠিত করার কাজ অব্যাহতভাবে পরিচালিত হয়।

 

 লিগ্যাল এইড উপপরিষদ

নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানুষের বিবেক জাগ্রত করার জন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে নির্যাতনের শিকার নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্মূলের আন্দোলন পরিচালনা করছে।

লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদ নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আইন সহায়তা, চিকিৎসা সেবা ও আশ্রয় প্রদানসহ সেবামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি এবং আইন সংস্কার ও আইন প্রণয়নের জন্য এডভোকেসী/লবী ও রাজপথে আন্দোলনসহ আন্দোলনমূখী কার্যক্রম। সমাজে, রাষ্ট্রে পরিবারে নারী নির্যাতন বিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে তরুণ ও পুরুষ সমাজকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হচ্ছে নারী নির্যাতন বিরোধী সংগ্রামে এবং গ্রহণ করা হচ্ছে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচী।

আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ নাগরিক সমাজকে নিয়ে সামাজিকভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রতিরোধের আন্দোলন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে আইন সংস্কারের বিভিন্ন সুপারিশমালা পেশ করছে, নতুন আইন প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০; পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) ২০০৩, The Citizenship (Amendment) Act, 2009 বিষয়ে সুপারিশমালা পেশ করেছে। প্রস্তাবিত যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন, ২০১০ এর খসড়া প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০; মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২; হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২; প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এর খসড়া আইন তৈরিতে কাজ করেছে। ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড) আইন, ২০১৩ বিষয়ে সুপারিশমালা পেশ হয়েছে যা মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৯৯৮-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে আনীত বিল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর প্রস্তাবিত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৩ (খসড়া), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিডও বেঞ্চ বুক, আইন কমিশনের প্রস্তাবিত বৈষম্য বিলোপ আইন, ২০১৪ (খসড়া) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ এর সংশোধনী বিষয়ে সুপারিশমালা পেশ করেছে। ১৯৮৯ সালে বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন সংস্কারের লক্ষ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইনের খসড়া বক্তব্য তৈরি করে সকলের মতামত নিয়ে ১৯৯৩ সালে প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করা হয়। সেই সময় থেকেই অভিন্ন পারিবারিক আইন বিষয়ক (UFC)  এডভোকেসি-লবি আন্দোলন অব্যাহতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

২০০৯ সালে উত্ত্যক্ত, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নরোধে মহামান্য হাইকোর্টের দেয়া রায় এবং ২০১২ সালে ফতোয়া বন্ধে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের রায়ের আলোকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গণমানুষের সাথে মতবিনিময় সভা/কর্মশালাসহ বহুমুখী আন্দোলন পরিচালনা করে যাচ্ছে।  নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহকে সক্রিয় রাখার লক্ষ্যে নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নিয়ে ১০/১৫ জনের ভিলেজ ওয়াচ টিম গঠন করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে এবং এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার। এর মাধ্যমে ঢাকা, রাঙামাটি, রাজশাহী, সিলেট, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে মহিলা পরিষদ কাজ করছে। এছাড়া ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সাথে মহিলা পরিষদ সহযোগি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারী নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্যাতনের শিকার নারীদের আইনগত পরামর্শ, তদন্ত, কাউন্সেলিং, সালিশী কার্যক্রম ছাড়াও মামলা পরিচালনা এবং মামলার রায় কার্যকর করার জন্য আন্দোলন করছে। এছাড়াও জনস্বার্থে মহিলা পরিষদ মামলা করে থাকে। উল্লেখ্য যে, এ বছরে সালিশীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য ৮৯,৮২,৬০১ টাকা দেনমোহর আদায় করা সম্ভব হয়েছে।

 

আন্দোলন উপপরিষদ

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় সম-অংশীদারিত্বের লক্ষ্যে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের অধিকার ও সুযোগ আরো কার্যকর, ব্যপক ও প্রসারিত করার দাবীতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আন্দোলন করে আসছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে সভানেত্রী সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে স্মারকলিপি জমা দেয়।

১৯৭৭-৭৮ সালে তৎকালীন মহিলা বিষয়ক উপদেষ্টা ফিরোজা বারীর কাছে পারিবারিক আদালতের দাবী পেশ করা হয়। তৃণমূল থেকে সংসদ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সামগ্রিক লক্ষ্য নিয়ে সংগঠিত করছে আন্দোলন উপ-পরিষদ।

১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ স্থানীয় সরকারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। মহিলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন তথ্য সরবরাহসহ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন- এর দাবিতে চতুর্দশ সংশোধনী বিল ২০০০ সালে এবং ২০১৩ সালে ষোড়শ সংশোধনী হিসাবে সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়। সুস্থ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতিতে দূর্নীতি ও দুবৃত্তায়ন বন্ধের দাবিতে মহিলা পরিষদ পরিচালনা করে ধারাবাহিক আন্দোলন। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার দাবিতে নির্বাচন কমিশিনের কাঠামো সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মৌলিক সংস্কার, নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করার দাবিতে জনমত গঠন ও আন্দোলন পরিচালনা করে। পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসনের লক্ষ্যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের দাবিতে অব্যাহত আন্দোলন এবং এডভোকিসী লবি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

৮০ এর দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জাতিসংঘ সনদ “নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ” (সিডও) এর পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করার পাশাপাশি নারী-পুরুষের সমতার লক্ষ্যে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নের দাবিতে মহিলা পরিষদ আন্দোলন করে চলছে।

 

প্রশিক্ষণ, গবেষণা পাঠাগার উপপরিষদ

নারী  সমাজকে সংগঠিত করে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনের সদস্য, কর্মী ও সংগঠকদের পেশাদারী দক্ষতা বৃদ্ধি, নারী আন্দোলনের কর্মধারা – পদ্ধতি ও তত্ত্বগত বিষয়ে স্বচ্ছ  ধারনা প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা পরিষদ বহুমাত্রিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে।

মহিলা পরিষদ তিনধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেঃ সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তত্ত্বগত প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক কাজ পেশাদারী দক্ষতার সাথে পরিচালনার লক্ষ্যে বাস্তব কাজের ধারা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও আইন বিষয়ক প্যারালিগ্যাল প্রশিক্ষণ। এছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবিদের মধ্যে নারী আন্দোলন ও জাতিসংঘ সিডও সনদ নিয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়।

এ প্রশিক্ষণ তিনভাবে প্রদান করা হয়। ১. প্রশিক্ষক প্রশিক্ষন কেন্দ্রীয় কমিটি ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের জন্য। ২. কর্মী সংগঠক প্রশিক্ষণ। ৩. সাধারন সদস্যদের প্রশিক্ষণ।

২০১১ থেকে প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। চালু হয়েছে জেন্ডার উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক  ত্রৈমাসিক সার্টিফিকেট কোর্স। বিভিন্ন  উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠন, গবেষক, ছাত্র-ছাত্রী এই সার্টিফিকেট কোর্সে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সিপিডি ও বিআইডিএস এর গবেষকবৃন্দ এবং নারী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই কোর্সের ক্লাস পরিচালনা করেন। এ কোর্স পরিচালনার মধ্য দিয়ে মহিলা পরিষদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

তরুণ প্রজন্মকে নারী আন্দোলনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে নারী আন্দোলনের ধারাকে আরো গতিশীল ও বেগবান করার লক্ষ্যে পরিচালনা করা হয় পাঠচক্র। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পাঠচক্র পরিচালনা করা হয়।

মহিলা পরিষদ সংবাদপত্রের আধেয় বিশ্লেষনের মাধ্যমে নারী নির্যাতন পরিস্থিতি নিয়ে সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। তাছাড়া বিষয়ভিত্তিক গবেষণাও পরিচালিত হয়।

মহিলা পরিষদ একটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করে যেখানে নারী আন্দোলন ও গবেষণা, সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি,  মানবাধিকার আন্দোলন, সাহিত্য, প্রবন্ধ, জীবনী, স্মৃতিকথা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রয়েছে। মহিলা পরিষদ গ্রন্থাগার রেফারেন্স উপকরনে সমৃদ্ধ। গবেষক, ছাত্র-ছাত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবিসহ অনেকেই এই রেফারেন্স সেবা গ্রহণ করে থাকেন।

রোকেয়া  সদন উপপরিষদ

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্মূল কাজের অবিচ্ছেদ্য কার্যক্রম হিসাবে ১৯৮৩ সাল থেকে পরিচালনা করা হয় রোকেয়া সদন। এটি নির্যাতনের শিকার নারীর সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র। রোকেয়া সদন নি¤œলিখিত কাজগুলো করে-

  • নির্যাতনের শিকার নারীর শারীরিক ও মানসিক আঘাত নিরূপন ও নিরাময়ের ব্যবস্থা করা।
  • নির্যাতনের শিকার নারীর মনে সাহস সঞ্চার করে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা সৃষ্টি করা।
  • ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সবধরনের সহায়তা প্রদান।
  • পূনর্বাসনের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান এবং ছবি আঁকা ও সংগীত প্রশিক্ষণ।
  • বসবাসকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দময়, সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ গড়ে তোলা।

 

প্রচার গণমাধ্যম উপপরিষদ

প্রচার ও গণমাধ্যম উপ-পরিষদের মাধ্যমে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গনমাধ্যমের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সংগঠনের বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণমাধ্যমের বর্ধিত কার্যকর ভূমিকা মনিটরিং করছে। নারী বিষয়ক ইস্যুতে মহিলা পরিষদসহ বৃহত্তর নারী সমাজের দাবী গণমাধ্যমে প্রতিফলিত করা, গণমাধ্যমে কর্মরত নারীর অবস্থা ও অবস্থান শক্তিশালী করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগহণ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে গণমাধ্যম উপ-পরিষদ কাজ করে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা কর্মরত আছেন তাদের সাথে নারী বিষয়ক বিভিন্ন ইস্যু, সমাজে নারীর ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরার জন্য মতবিনিময় ও আলোচনা সভা করে থাকে। গণমাধ্যম উপ-পরিষদ রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণমাধ্যমকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে তোলার জন্য গ্রহণ করছে বিভিন্ন কর্মসূচি। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী চেতনা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে গণমাধ্যমের সাথে মতবিনিময় আলোচনা সভা করে।

 

প্র কা না  রি

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ত্রৈমাসিক মুখপত্র মহিলা সমাচার ১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানমের সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে মহিলা পরিষদ জার্নাল। জার্নালে নারী আন্দোলনের বৈশ্বিক, জাতীয়, আঞ্চলিক, ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক ও চলমান যাবতীয় প্রসঙ্গ, সম্ভাবনা, সমস্যা, প্রশ্ন ও প্রত্যাশাসমূহ সম্পর্কে তাত্ত্বিক, তথ্যগত ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে।

মহিলা সমাচার ও মহিলা পরিষদ জার্নাল ব্যতীত প্রকাশনা উপ-পরিষদ প্রকাশ করে থাকে সংগঠনের অন্যান্য প্রকাশনা। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনাসমূহ হল :

বেগম রোকেয়া স্মরণিকা [১৯৭৯]; নারীমুক্তি আন্দোলন ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ [১৯৮৩]; বাংলাদেশে নারী অধিকার ও আইন সংস্কার [১৯৯২]; নারীর আইনগত অধিকার ও সহায়তা; ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড [১৯৯৩]; প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার : মানবদরদী আদর্শ সংগ্রামী নারী [১৯৯৯]; চিরঞ্জীব সুফিয়া কামাল [মহিলা সমাচার বিশেষ সংখ্যা, ২০০০]; মৌলবাদ মানবাধিকারের অন্তরায় [২০০৬]; ধর্ষণচিত্র ২০০০-০৪ [২০০৬]; ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড [২০০৬], মুক্তিযুদ্ধ দিনের স্মৃতি ইত্যাদি।

 

আন্তর্জাতিক উপপরিষদ

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিলের [ECOSOC] এনজিও পদমর্যাদাভুক্ত সংগঠন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্মসূচী, জাতিসংঘের মর্যাদা বিষয়ক কমিশনের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে  প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও তথ্য আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে সংগঠনের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। সংগঠনের অভ্যন্তরে নারীর মানবাধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং সাম্প্রতিক তথ্য সম্পর্কে সংগঠক, কর্মীদের জানার পরিধি বিস্তৃত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উপ-পরিষদ বৈশ্বিক নারীর মানবাধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক উদ্যোগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে চলেছে। উল্লেখ্য যে, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রথম জাতিসংঘের সিডও সনদের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে এদেশে সিডও বাস্তবায়ন আন্দোলনের সূচনা করে। জাতিসংঘ সিডো পলিসিতে নিয়মিত সিডও অবস্থার বিষয়ে ছায়া প্রতিবেদক/বিকল্প প্রতিবেদন প্রেরণ করে। এ প্রতিবেদন কখনো এককভাবে, কখনও যৌথভাবে প্রেরন করা হয়।

স্বাস্থ্য উপপরিষদ

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারী স্বাস্থ্যকে নারীর অধিকারের সম্পৃক্ত করে কায়রো-জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন (ICPD), সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ৪,৫ এবং ১৯৯৫ সালে ৪র্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গৃহীত বেইজিং কর্মপরিকল্পনার (BPFA) আলোকে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীর উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াসে স্বাস্থ্য উপ-পরিষদের মাধ্যমে কাজ করে চলেছে।

বর্তমানে মাতৃকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে স্বাস্থ্য উপ-পরিষদ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, আন্তর্জাতিক নারী স্বাস্থ্য দিবস, নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন, বয়ঃসন্ধিকালীন এবং নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা ও নারীর স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারণ ও কর্মসূচী বাস্তবায়নে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার সাথে সম্পৃক্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি জাতীয় বাজেটে নারীর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করছে।

 

সমাজকল্যাণ উপপরিষদ

নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ উপ-পরিষদের মাধ্যমে সেবামূলক ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বহুমূখী কাজ করে যাচ্ছে। ৭০এর দশক থেকেই সমাজকল্যান উপ-পরিষদ বর্ন্যাত্যদের জন্য ত্রান, শীতার্ত মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ, ঘূর্ণিঝড়,মঙ্গা ,আইলা,খড়ার কারনে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে কেন্দ্র ও বিভিন্ন জেলা শাখার মাধ্যমে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা, বৃত্তিমূলক কাজ , স্কুলে ভ্যান প্রকল্প, মশা নিধন অভিযান, এসিড দগ্ধদের সহায়তা করা, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে আসছে। বিশেষ সংকটে ব্যক্তিবিশেষের পাশেও সংগঠন এবং সংগঠকরা  সহায়তার হাত প্রসারিত করেছে।

পরিবেশ উপপরিষদ

৮০র দশকের শেষার্ধে সারা বিশ্বে পরিবেশ রক্ষার আন্দালন গড়ে উঠল বাংলাদেশও তার অংশীদার হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদও এই আন্দালনে যুক্ত হয়। জলাভূমি রক্ষা আইন, নদী রক্ষা আইন, অবকাঠামো নির্মাণ আইন, ইত্যাদি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আন্দোলনের সাথে মহিলা পরিষদ যুক্ত রয়েছে। পরিবেশ আইন সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার কাজে মহিলা পরিষদ প্রেসার গ্রুপ বা মিডিয়েটরের ভূমিকা পালনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

 

শিক্ষা সংস্কৃতি উপপরিষদ

সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা উপ-পরিষদের উদ্যোগে নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে অবৈতনিক বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করা হতো। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি উপ-পরিষদের উদ্যোগে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনে বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত থাকা এবং নিজস্ব সাংগঠনিক উদ্যোগে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা অপসংস্কৃতির বিরূদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়। বিজ্ঞানমনষ্ক আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা দাবীতে মহিলা পরিষদ শিক্ষা এবং পাঠ্যক্রমে ও পাঠ্য পুস্তকে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার লক্ষ্যে মন্ত্রনালয়ে ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহে স্মারকলিপি প্রদান করে থাকে। প্রদত্ত শিক্ষা নীতি বিষয়ে মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে সুপারিশমালা প্রদান করা হয়।