সুফিয়া কামাল আমাদের প্রেরণার উৎস -সীমা মোসলেম

সুফিয়া কামাল একজন ব্যক্তি, সুফিয়া কামাল একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর জীবনব্যাপী কর্মধারা বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি, ব্যক্তি কিভাবে হয়ে উঠতে পারে প্রতিষ্ঠান। রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের প্রজ্বলিত মশাল হাতে নিয়ে সেই যে সমাজ বিকাশের কাজে তিনি আত্মনিবেদন করেন কৈশোর-যৌবনের সূচনায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একই কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। কবি ও সমাজকর্মী—তাঁর দুই সত্তার মধ্যে ছিল না কোনো বিরোধ।

তাই তো তিনি বলেছেন, ‘নিঃশ্বাস নিঃশেষ হউক, পুষ্প বিকাশের প্রয়োজনে। ’ আজীবন তিনি এই ফুল ফোটানোর কাজই করেছেন।
বিকশিত সামাজিক শক্তিই সমাজের মুক্তি ঘটাবে—এই আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন সুফিয়া কামাল। তিনি কোনো দিন প্রথাগত রাজনীতি করেননি, কিন্তু তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ছিল, তা হচ্ছে মানবমুক্তি। সেই মানবমুক্তির লক্ষ্যে মানবতার সাধনা করে গেছেন আজীবন। অধিকারহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করেছেন। কচিকাঁচার মেলার শিশু-কিশোরদের সংগঠিত করার কাজে নিবেদিত ছিলেন, এই লক্ষ্যে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আবার একই সঙ্গে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও পশ্চাত্পদ নারী সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজে মহিলা পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মানবিক মূল্যবোধ গড়ার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক চেতনার গুরুত্ব ছিল তাঁর কাছে অপরিসীম। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের প্রতিবাদী কর্মসূচি থেকে শুরু করে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ গঠন ইত্যাদি কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সুফিয়া কামাল। দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ববাংলার জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বাঙালির জাতীয় বিকাশের সংগ্রাম, সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রভাগে ছিলেন সুফিয়া কামাল। বাঙালি জাতির আত্মবিকাশের ধারা ও সুফিয়া কামাল হয়ে ওঠার ধারা তাই ছিল একই সূত্রে গাঁথা।

তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল সুফি বাবার নিরুদ্দেশ যাত্রার মধ্য দিয়ে। মামাবাড়িতে আদর-ভালোবাসায় বড় হলেও ছোটবেলায় পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। মা ও মেয়ের সেই থেকে বন্ধুর প্রতিকূল পথ পাড়ি দেওয়া শুরু হয়। এই সংগ্রামী জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। পারিবারিকভাবে মেয়েদের লেখাপড়ার চল না থাকলেও স্ব-উদ্যোগে গভীর নিষ্ঠায় তিনি লেখাপড়া ও লেখালেখি করেছেন। তিরিশের দশকে সওগাত পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। যদিও এর আগে বরিশালে থাকাকালে ‘সৈনিক বধূ’ নামে তাঁর একটি গল্প প্রকাশিত হয়। নারীদের ছবিসহ প্রথম যে সওগাত মহিলা সংখ্যা প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম লেখক ছিলেন সুফিয়া কামাল, যা ছিল সেই আমলের রক্ষণশীল সমাজে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তিরিশের দশকের সেই বলিষ্ঠ ভূমিকা তাঁর ক্ষেত্রে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। যেখানে অন্যায়, মানবতার অপমান, সেখানে সুফিয়া কামাল, তা সে সামাজিক সংস্কার হোক বা রাজনৈতিক বিষয় হোক।

পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের মতো প্রগতিবিরোধী, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রে মুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন লেখক-বুদ্ধিজীবীরা যখনই দেশের নানা অঞ্চলে সাহিত্য সম্মেলন করেছেন যেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হবে, সেখানে সুফিয়া কামাল অংশ নিয়েছেন। ষাটের দশকে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন ছিল এমনই প্রতিবাদী আন্দোলন, নিছক জন্মবার্ষিকী পালন নয়। সেখানেও মূল নেতৃত্বে ছিলেন সুফিয়া কামাল। একইভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, দেশের ভেতরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কড়া নজরদারিতে থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ইত্যাদি প্রধান জাতীয় ঘটনার সময় যথাযোগ্য ভূমিকা পালনে তিনি এগিয়ে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ভূমিকা আমরা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ পড়ে জানতে পারি। পরবর্তীকালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা, যুদ্ধাপরাধের বিচার—সব ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা।

‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’—এই বাণী আজ বৈশ্বিক স্লোগান। নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিকভাবে এ কথা স্বীকৃতি অর্জন করেছে যে ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’। ‘নারী নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘন’, এ কথা এরও আগে আশির দশকে সুফিয়া কামাল বলেছেন। তাঁর সেই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মহিলা পরিষদ চার দশকের অধিক সময়জুড়ে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছে। তিনি ছিলেন সব সময়ের জন্য আধুনিক। তিরিশের দশকের সামাজিক কর্মকাণ্ডে দীক্ষা নেওয়া সুফিয়া কামাল যখন শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও একই দৃঢ়তায়, একই গতিতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, অশুভের বিরুদ্ধে মানবতার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখেন, অত্যাচার ও দুর্ভোগের শিকার মানুষ তাঁর কাছে আশ্রয় খোঁজে-ভরসা পায়, তখন বোঝা যায় তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত আধুনিক মনের মানুষ।

বাংলাদেশে যেকোনো দুর্দিনে, সংকটে, দুঃসময়ে, সংঘাতে সমাজের নানা মতের, নানা পথের মানুষ তাঁকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসনে মানবতা যখন লাঞ্ছিত, ধর্মান্ধতার শিকার নারী-পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা—যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি এগিয়ে এসেছেন। নির্যাতনের শিকার কিশোরী-যুবতীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস জুগিয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন, আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন সংগঠনের কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন, ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের কাজের ভিন্নতাও ছিল, কিন্তু সুফিয়া কামালের ছিল সর্বজনীন সত্তা, সবার তিনি আপন। সুফিয়া কামালের এই সত্তার পেছনে ছিল ন্যায়বোধ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তাঁর চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস জুগিয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘সমাজের বিবেকজননী সাহসিকা’। ব্যক্তিজীবনে তাঁকে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনের মধ্যে ছিল এক সাযুজ্য। এই সাযুজ্য তাঁর সামাজিক কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশে দেখা যায় ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা উসেক দেওয়ার অপতত্পরতায় নিয়োজিত রয়েছে একটি গোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশের আদর্শের পরিপন্থী কাজ করে চলেছে। জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে নানাভাবে, বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর আঘাত হানছে নৃশংসভাবে। একের পর এক নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যা করা হচ্ছে মুক্তমনা লেখকসহ বিভিন্ন ধর্মের পুরোহিত-পূজারি ও গির্জার ফাদারদের। ক্রমান্বয়ে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হচ্ছে না। ফলে উগ্র জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী তাদের আক্রমণ রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর ওপর চালানোর সাহস পাচ্ছে। এ দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টায় রত রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার মাত্রা ও নৃশংসতা ও বর্বরতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনার বিচার তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে, যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখছে না বা দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। দোষীর শাস্তি না পাওয়া অর্থাৎ বিচারহীনতা জনমনে আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। এই রকম সংকটজনক পরিস্থিতিতে সুফিয়া কামালের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। আজ তিনি থাকলে এই পরিস্থিতিতে নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় থাকতেন না। তাঁর সাহসী সংগ্রামী প্রতিরোধ চেতনায় দীপ্ত মানসিকতা নিয়ে সমাজের বিবেক জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানাতেন, সবাইকে সমবেত করতেন।

সুফিয়া কামালের মতো আইকন হয়তো যুগে যুগে একটি-দুটি জন্ম নেন। কিন্তু তাঁদের প্রেরণা ও কর্ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মোত্তর মানুষকে উজ্জীবিত করে থাকে, সমাজের শুভ ও কল্যাণ চেতনা বহমান রাখে। সমাজের এই শুভ কল্যাণ চেতনার শক্তি বিকশিত করার মধ্য দিয়ে সুফিয়া কামালের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব। তিনি একা যে কাজ করে গেছেন, সবার সম্মিলিত প্রয়াসে তা করার পথে অগ্রসর হতে হবে। তবেই সমাজের মুক্তি ঘটবে।

লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠ

Share this news on

You might also interest

Marufa Begum

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি ও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত -ড. মারুফা বেগম

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। কিশোরী ইয়াসমিন, যাকে পুলিশের কয়েকজন সদস্য দিনাজপুরের দশমাইল মোড় থেকে শহরের রামনগরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ভ্যানে তুলে নেন।

Read More »
Debahuti

অন্যায় যে সহে : প্রেক্ষিত বাংলাদেশে নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় -দেবাহুতি চক্রবর্তী

নড়াইলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ না, আজ আমি বাংলাদেশের অতিক্রান্ত ৫০ বছরের ধর্মীয়, নৃত্তাত্বিক, ভাষাগত বা চেতনাগত প্রগতিশীল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর

Read More »

পোশাকের স্বাধীনতা ও নারীর সমতায়ন – স্বাতী চৌধুরী

পোশাকের স্বাধীনতার কথা বললে আরেকটি বিষয় সামনে এসে যায় তা হলো—ড্রেস কোড। সারা পৃথিবীতে এবং আমাদের দেশেও ড্রেস কোড আছে। স্কুলপর্যায়ে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব

Read More »

Copyright 2022 © All rights Reserved by Bangladesh Mahila Parishad, Developed by Habibur Rahman